সাদা স্রাব হলো যোনিপথ থেকে নিঃসৃত শ্বেতাভ বা হালকা হলুদ তরল, যা জরায়ুমুখ ও যোনির গ্রন্থি থেকে নির্গত হয় এবং প্রজনন অঙ্গকে সংক্রমণমুক্ত রাখে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে লিউকোরিয়া বলা হয়।
লিউকোরিয়া দুই ধরনের হয়: স্বাভাবিক (ফিজিওলজিক্যাল) এবং অস্বাভাবিক (প্যাথলজিক্যাল)। স্বাভাবিক সাদা স্রাব গন্ধহীন, পাতলা এবং স্বচ্ছ থেকে দুধের মতো সাদা হয়। অস্বাভাবিক সাদা স্রাব দুর্গন্ধযুক্ত, গাঢ় হলুদ বা সবুজ রঙের হয় এবং চুলকানি বা জ্বালাপোড়া তৈরি করে।
ইউনানি চিকিৎসাশাস্ত্রে সাদা স্রাবকে সাইলান আল-রাহিম (سيلان الرحم) নামে অভিহিত করা হয়। ইবনে সিনার আল-কানুন ফিত-তিব গ্রন্থে এই অবস্থাকে জরায়ুর রতুবত (আর্দ্রতা) বৃদ্ধি এবং মিজাজ বরিদ-রতুব (ঠান্ডা-আর্দ্র প্রকৃতি) এর প্রকাশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
সাদা স্রাবের কারণ কী কী?
সাদা স্রাবের ৬টি প্রধান কারণ আছে, যেমন: হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ, ছত্রাক সংক্রমণ, পুষ্টির ঘাটতি, মানসিক চাপ এবং অপরিচ্ছন্নতা।- হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের স্তর পরিবর্তন করে।
- ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস যোনির স্বাভাবিক ব্যাকটেরিয়া ভারসাম্য নষ্ট করে।
- ক্যান্ডিডা ছত্রাক সংক্রমণ ঘন সাদা স্রাব তৈরি করে।
- আয়রন ও প্রোটিনের ঘাটতি জরায়ুর দুর্বলতা সৃষ্টি করে।
- দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে হরমোন ক্ষরণ ব্যাহত করে।
- অপরিচ্ছন্ন অন্তর্বাস ব্যবহার সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।
সাদা স্রাব কমাতে কোন খাবার খাওয়া উচিত?
সাদা স্রাব নিয়ন্ত্রণে ৭টি খাদ্য উপাদান কার্যকর, যেমন: মেথি বীজ, ডালিম, কলা, দই, আমলকী, ভেন্ডি এবং তুলসী পাতা।মেথি বীজ (Fenugreek)
মেথি বীজ জরায়ুর পেশি শক্তিশালী করে এবং অতিরিক্ত স্রাব কমায়। মেথি বীজে থাকা ডায়োসজেনিন উপাদান হরমোন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। ২ চা চামচ মেথি বীজ সারারাত পানিতে ভিজিয়ে সকালে খালি পেটে সেবন করলে ফল পাওয়া যায়।ডালিম (Pomegranate)
ডালিম জরায়ুর আস্তরণ শক্তিশালী করে এবং রক্তস্বল্পতা দূর করে। ডালিমের বীজ ও খোসায় থাকা ট্যানিন উপাদান প্রদাহ কমায় এবং স্রাবের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে।দই (Curd)
দই-এ থাকা ল্যাকটোব্যাসিলাস ব্যাকটেরিয়া যোনির প্রাকৃতিক pH ভারসাম্য রক্ষা করে এবং ছত্রাক সংক্রমণ প্রতিরোধ করে। প্রতিদিন ১ বাটি টক দই খাওয়া উপকারী।কলা ও দুধ
পাকা কলা দুধের সাথে মিশিয়ে খেলে জরায়ুর দুর্বলতা দূর হয় এবং শরীরে শক্তি যোগায়। কলায় থাকা পটাশিয়াম পেশি সংকোচন নিয়ন্ত্রণ করে।আমলকী (Amla)
আমলকীতে থাকা ভিটামিন সি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং জরায়ুর কোষ পুনর্গঠনে সহায়তা করে।ভেন্ডি (Okra) ও তুলসী পাতা
ভেন্ডির মিউসিলেজ উপাদান জরায়ুর প্রদাহ কমায়। তুলসী পাতার রস প্রতিদিন সকালে সেবন করলে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ নিয়ন্ত্রিত থাকে।সাদা স্রাব নিরাময়ে ঘরোয়া উপায় কী কী?
সাদা স্রাব নিরাময়ে ৫টি ঘরোয়া পদ্ধতি কার্যকর, যেমন: চালের মাড় সেবন, মেথি বীজের পানি পান, তুলসী পাতার রস, নিম পাতার ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম।চালের মাড় (Rice Starch)
ভাত রান্নার পর অবশিষ্ট ঘন মাড় ঠান্ডা করে প্রতিদিন সকালে পান করলে জরায়ুর আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রিত হয়। এই পদ্ধতি ইউনানি চিকিৎসায় বলগমি মিজাজ সংশোধনে ব্যবহৃত হয়।নিম পাতার ব্যবহার
নিম পাতা ফুটিয়ে সেই পানি দিয়ে যোনিপথের বাহ্যিক অংশ পরিষ্কার করলে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক সংক্রমণ কমে। নিম পাতায় থাকা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল উপাদান জীবাণু ধ্বংস করে।পরিচ্ছন্নতা ও পোশাক
সুতি কাপড়ের ঢিলেঢালা অন্তর্বাস ব্যবহার আর্দ্রতা শুষে নেয় এবং সংক্রমণের ঝুঁকি কমায়। প্রতিদিন অন্তর্বাস পরিবর্তন করতে হয়।পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পানি পান
দৈনিক ৮ গ্লাস পানি পান শরীরের টক্সিন দূর করে এবং হরমোন ভারসাম্য বজায় রাখে। ৭ ঘণ্টা ঘুম স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্ষমতা স্বাভাবিক রাখে।সাদা স্রাবে কোন খাবার এড়িয়ে চলা উচিত?
সাদা স্রাব নিয়ন্ত্রণে ৪টি খাবার পরিহার করা প্রয়োজন, যেমন: অতিরিক্ত মিষ্টি জাতীয় খাবার, ভাজাপোড়া খাবার, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং অতিরিক্ত চা-কফি।- চিনি ও মিষ্টি খাবার ছত্রাক বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
- ভাজাপোড়া খাবার শরীরে তাপ ও প্রদাহ বাড়ায়।
- প্রক্রিয়াজাত খাবারে থাকা সংরক্ষক উপাদান হরমোন বিঘ্নিত করে।
- অতিরিক্ত ক্যাফেইন স্নায়ুতন্ত্র উত্তেজিত করে এবং হরমোন ক্ষরণ ব্যাহত করে।

