শতাবরী দিয়ে মাসিকের অনিয়ম ও লিউকোরিয়া দূর করার উপায়

শতাবরী মূল ও গুঁড়া দিয়ে মাসিকের অনিয়ম ও লিউকোরিয়া দূর করার ফর্মুলা

শতাবরী (Asparagus racemosus) নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যে ব্যবহৃত একটি মূল ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক ভেষজ। এই ভেষজ মাসিকের অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করে এবং লিউকোরিয়ার লক্ষণ কমায়। হাকিম সুলতান মাহমুদ এই আর্টিকেলে শতাবরী ব্যবহারের সম্পূর্ণ ফর্মুলা, উপাদান, উপকারিতা, ব্যবহার পদ্ধতি ও সতর্কতা তুলে ধরেন।

শতাবরী দিয়ে মাসিকের অনিয়ম লিউকোরিয়া দূর করার ফর্মুলা কী?

শতাবরী ফর্মুলা হলো শতাবরী মূলের গুঁড়া দুধ বা মধুর সাথে মিশিয়ে নির্দিষ্ট মাত্রায় সেবনের একটি ইউনানি পদ্ধতি এই ফর্মুলা জরায়ু যোনিপথের স্বাস্থ্য উন্নত করে, হরমোন ভারসাম্য বজায় রাখে এবং মাসিকচক্র নিয়মিত করে

শতাবরী Asparagaceae পরিবারের একটি বহুবর্ষজীবী লতানো গাছ। এই গাছের মূল অংশ ভেষজ চিকিৎসায় ব্যবহার হয়। ইউনানি চিকিৎসাশাস্ত্রে শতাবরীকে Rasayana শ্রেণির ভেষজ হিসেবে গণ্য করা হয়, যা শরীরের কোষ পুনর্গঠনে সহায়তা করে।

মাসিকের অনিয়ম বলতে মাসিকচক্রের সময়কাল, রক্তক্ষরণের পরিমাণ বা নিয়মিততায় বিচ্যুতি বোঝায়। লিউকোরিয়া বলতে যোনিপথ থেকে অস্বাভাবিক সাদা বা হলুদ স্রাব নির্গমন বোঝায়। শতাবরী উভয় অবস্থায় জরায়ুর টিস্যু মজবুত করে এবং স্রাব নিয়ন্ত্রণ করে।

শতাবরীর রাসায়নিক উপাদান কী কী?

শতাবরীতে ৭টি প্রধান রাসায়নিক উপাদান থাকে, যেমন: শতাভারিন (Shatavarin IV), স্টেরয়েডাল স্যাপোনিন, ফ্লাভোনয়েড, রেসিমোফুরান, অ্যালকালয়েড, ট্যানিন এবং মিউসিলেজ

  • শতাভারিন (Shatavarin IV) — শতাবরীর প্রধান স্টেরয়েডাল স্যাপোনিন, যা ফাইটোইস্ট্রোজেন হিসেবে কাজ করে এবং জরায়ুর হরমোন গ্রাহকের সাথে সংযুক্ত হয়।
  • স্টেরয়েডাল স্যাপোনিনকোষের প্রদাহ কমায় এবং জরায়ুর আস্তরণ মজবুত করে।
  • ফ্লাভোনয়েডঅক্সিডেটিভ স্ট্রেস প্রতিরোধ করে এবং কোষ ক্ষয় রোধ করে।
  • রেসিমোফুরানব্যথানাশক ও প্রদাহনাশক গুণ প্রদান করে।
  • অ্যালকালয়েডস্নায়ুতন্ত্র শান্ত রাখে এবং হরমোন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
  • ট্যানিনকষযুক্ত (astringent) গুণ প্রদান করে, যা অতিরিক্ত স্রাব শুষে নেয়।
  • মিউসিলেজযোনিপথের শুষ্কতা কমায় এবং টিস্যু নরম রাখে।

শতাবরী মাসিকের অনিয়ম লিউকোরিয়ায় কীভাবে কাজ করে?

শতাবরীর ফাইটোইস্ট্রোজেন উপাদান ইস্ট্রোজেন হরমোনের কার্যপদ্ধতি অনুকরণ করে জরায়ুর আস্তরণ নিয়ন্ত্রণ করে এর প্রদাহনাশক গুণ যোনিপথের সংক্রমণ কমায় এবং কষযুক্ত গুণ অতিরিক্ত স্রাব শুষে নেয়

ফাইটোইস্ট্রোজেন শরীরের প্রাকৃতিক ইস্ট্রোজেন হরমোনের কাঠামোর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ একটি উদ্ভিজ্জ যৌগ। শতাবরীর শতাভারিন-৪ জরায়ুর ইস্ট্রোজেন গ্রাহকের সাথে সংযুক্ত হয়ে মাসিকচক্রের হরমোন ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করে।

স্টেরয়েডাল স্যাপোনিন যোনিপথের মিউকাস মেমব্রেনে প্রদাহ কমায়, ফলে ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাসজনিত সংক্রমণের সম্ভাবনা হ্রাস পায়। ট্যানিন উপাদান টিস্যুর কোষ সংকুচিত করে অতিরিক্ত স্রাব নিঃসরণ কমায়।

শতাবরীর উপকারিতা কী কী?

শতাবরীর ৭টি প্রধান উপকারিতা আছে, যেমন: মাসিকচক্র নিয়মিতকরণ, লিউকোরিয়া হ্রাস, জরায়ু মজবুতকরণ, হরমোন ভারসাম্য রক্ষা, রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ, দুগ্ধ বৃদ্ধিতে সহায়তা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি

  • মাসিকচক্র নিয়মিতকরণশতাবরী হরমোন ভারসাম্য রক্ষা করে মাসিকের তারিখ ও রক্তক্ষরণের পরিমাণ নিয়মিত করে।
  • লিউকোরিয়া হ্রাসকষযুক্ত গুণ যোনিপথের অতিরিক্ত স্রাব কমায়।
  • জরায়ু মজবুতকরণস্টেরয়েডাল স্যাপোনিন জরায়ুর টিস্যু পুনর্গঠনে সহায়তা করে।
  • হরমোন ভারসাম্য রক্ষাফাইটোইস্ট্রোজেন ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের অনুপাত নিয়ন্ত্রণ করে।
  • রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধআয়রন শোষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে মাসিকজনিত রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ করে।
  • দুগ্ধ বৃদ্ধিতে সহায়তাপ্রসূতি নারীদের স্তন্যদুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধি করে।
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিফ্লাভোনয়েড অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমিয়ে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করে।

শতাবরী ফর্মুলা কীভাবে ব্যবহার করবেন?

শতাবরী মূলের গুঁড়া দৈনিক গ্রাম থেকে গ্রাম মাত্রায় দুধ বা মধুর সাথে মিশিয়ে সকালে খালি পেটে এবং রাতে ঘুমানোর আগে সেবন করতে হয় এই ফর্মুলা একটানা মাস ব্যবহার করতে হয়

কাঁচা শতাবরী গুঁড়া দিয়ে ব্যবহার পদ্ধতি

শতাবরী মূল রোদে শুকিয়ে গুঁড়া তৈরি করতে হয়। এক চা চামচ (৩ গ্রাম) গুঁড়া এক গ্লাস কুসুম গরম পানিতে মিশিয়ে সকালে খালি পেটে পান করতে হয়। টানা ৯০ দিন এই পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়।

দুধের সাথে শতাবরী ব্যবহার পদ্ধতি

এক চা চামচ শতাবরী গুঁড়া এক কাপ গরম দুধে মিশিয়ে রাতে ঘুমানোর আগে পান করতে হয়। দুধের ক্যালসিয়াম শতাবরীর শোষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং জরায়ুর পেশি শিথিল রাখে।

মধুর সাথে শতাবরী ব্যবহার পদ্ধতি

আধা চা চামচ শতাবরী গুঁড়া এক চা চামচ খাঁটি মধুর সাথে মিশিয়ে সকাল ও সন্ধ্যা দুইবার সেবন করতে হয়। মধু শতাবরীর প্রদাহনাশক গুণ বৃদ্ধি করে এবং স্বাদ সহনীয় করে।

শতাবরী সেবনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী?

শতাবরী সেবনে ৪টি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, যেমন: পেট ফাঁপা, অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া, ডায়রিয়া এবং ওজন বৃদ্ধি

  • পেট ফাঁপাঅতিরিক্ত মাত্রায় সেবনে হজমতন্ত্রে গ্যাস জমে।
  • অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়াAsparagaceae পরিবারের উদ্ভিদে সংবেদনশীল ব্যক্তিদের ত্বকে চুলকানি বা র‍্যাশ দেখা দেয়।
  • ডায়রিয়াউচ্চ মাত্রায় সেবনে অন্ত্রের গতিবিধি বৃদ্ধি পায়।
  • ওজন বৃদ্ধিদীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে ক্ষুধা বৃদ্ধির কারণে ওজন বৃদ্ধি ঘটে।

শতাবরী সেবনে কোন বিষয়ে সতর্ক থাকবেন?

গর্ভবতী নারী, কিডনি সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি এবং হরমোনসংবেদনশীল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শতাবরী সেবন করেন না

শতাবরী নির্দিষ্ট মাত্রায় সেবন করতে হয়। অতিরিক্ত মাত্রা হরমোন ভারসাম্য বিঘ্নিত করে।

মাসিকের অনিয়ম বা লিউকোরিয়া দীর্ঘস্থায়ী হলে, অথবা তীব্র ব্যথা, দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব বা জ্বর দেখা দিলে রোগী নিবন্ধিত চিকিৎসকের কাছে পরীক্ষা করান। এসব লক্ষণ সংক্রমণ বা অন্তর্নিহিত রোগের ইঙ্গিত দেয়, যার জন্য ক্লিনিক্যাল নির্ণয় প্রয়োজন হয়।

শতাবরী সম্পর্কে প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর

শতাবরী খেলে মাসিক নিয়মিত হয় কি?

শতাবরীর ফাইটোইস্ট্রোজেন উপাদান হরমোন ভারসাম্য রক্ষা করে মাসিকচক্র নিয়মিত করে। নিয়মিত ৩ মাস সেবনে ফলাফল লক্ষণীয় হয়।

লিউকোরিয়া কমাতে শতাবরী কতদিন খেতে হয়?

লিউকোরিয়া কমাতে শতাবরী একটানা ৯০ দিন সেবন করতে হয়। প্রথম ফলাফল ৪ সপ্তাহের মধ্যে দেখা যায়।

শতাবরী গুঁড়া দিনে কতবার খাওয়া যায়?

শতাবরী গুঁড়া দিনে ২ বার খাওয়া যায়, সকালে খালি পেটে এবং রাতে ঘুমানোর আগে। প্রতিবার মাত্রা ৩ গ্রাম থেকে ৫ গ্রাম।

গর্ভাবস্থায় শতাবরী খাওয়া যায় কি?

গর্ভবতী নারী চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শতাবরী সেবন করেন না। শতাবরীর হরমোন-প্রভাবক গুণ গর্ভাবস্থায় জটিলতা তৈরি করে।

শতাবরীর সাথে কোন ভেষজ মিশিয়ে খাওয়া যায়?

শতাবরীর সাথে মিশ্রি ও এলাচ মিশিয়ে খাওয়া যায়। এই মিশ্রণ হজম সহজ করে এবং স্বাদ উন্নত করে।

শতাবরী কোথায় পাওয়া যায়?

শতাবরী গুঁড়া ও মূল আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি ভেষজ দোকানে পাওয়া যায়। হাকিমসুলতান.কম-এর মাদার পেজে বিশদ তথ্য পাওয়া যায়।

শতাবরী নারীদের মাসিকচক্র নিয়মিত রাখে এবং লিউকোরিয়ার লক্ষণ কমায়। এই ভেষজের ফাইটোইস্ট্রোজেন ও কষযুক্ত গুণ জরায়ু ও যোনিপথের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখে। নির্দিষ্ট মাত্রায় ৩ মাস নিয়মিত সেবনে সর্বোত্তম ফলাফল পাওয়া যায়। মাসিকের অনিয়ম বা লিউকোরিয়া দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। আরও বিস্তারিত জানতে ও ব্যক্তিগত পরামর্শের জন্য হাকিম সুলতান মাহমুদের সাথে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করুন।

তথ্যসূত্র রেফারেন্স (References)

১. National Center for Complementary and Integrative Health (NCCIH) — Asian Ginseng and Other Adaptogenic Herbs: What You Need To Know. https://www.nccih.nih.gov/

২. Sharma, K. et al. (2021) — Asparagus racemosus (Shatavari): A Review on Its Cultivation, Morphology, Phytochemistry and Pharmacological Importance. PMC/NCBI. https://pmc.ncbi.nlm.nih.gov/

৩. WebMD Editorial — Shatavari: Overview, Uses, Side Effects, Precautions. https://www.webmd.com/

হেকিম সুলতান
লেখক সম্পর্কে

হেকিম সুলতান

BUMS, খুলনা ইউনানি মেডিকেল কলেজ