কালোজিরা: বৈজ্ঞানিক ও ইউনানি পরিচয়, উপাদান, উপকারিতা ও খাওয়ার নিয়ম

কালোজিরার উপকারিতা, উপাদান ও খাওয়ার নিয়ম
কালোজিরা বা কালো জিরা (বৈজ্ঞানিক নাম: Nigella sativa L.) Ranunculaceae পরিবারের একটি ঔষধি উদ্ভিদ। ইউনানি চিকিৎসায় একে হাব্বুল বারকাহ বলা হয়। এর বীজ ও তেল হজম, শ্বাসযন্ত্র, প্রদাহজনিত রোগ এবং পুরুষের যৌন স্বাস্থ্যের উন্নতিতে ব্যবহৃত হয়। আধুনিক গবেষণায় এর প্রধান উপাদান থাইমোকুইনোনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিইনফ্লেমেটরি কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে।

কালোজিরা কী?

কালোজিরা হলো Nigella sativa L. উদ্ভিদের কালো রঙের ছোট বীজ যা ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় হাজার বছর ধরে ব্যবহৃত হয়। এটি মূলত ভূমধ্যসাগরীয়, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে জন্মায়। এর বীজে তীব্র সুগন্ধ ও সামান্য তিক্ত স্বাদ রয়েছে।
কালোজিরা Ranunculaceae পরিবারের একটি বার্ষিক তৃণজাতীয় উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Nigella sativa L.। ইউনানি তিব্বতে একে হাব্বুল বারকাহ বা হাব্বাতুস সওদা নামে অভিহিত করা হয়। প্রাচীন গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটস এটিকে মেলানথিয়ন নামে উল্লেখ করেছিলেন। রান্নায় মসলা হিসেবে এবং ঔষধি উদ্দেশ্যে এর বীজ ও তেল ব্যবহার করা হয়।

কালোজিরার বৈজ্ঞানিক ও ইউনানি পরিচয়

কালোজিরার বৈজ্ঞানিক নাম Nigella sativa L. এবং ইউনানি নাম হাব্বুল বারকাহ। ইউনানি চিকিৎসায় এটি দ্বিতীয় মাত্রার গরম ও শুষ্ক মিজাজের ঔষধ। তিব্বে নববিতেও এর নিয়মিত সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এটি দাম, বলঘম, সাফরা ও সওদা আখলাতের ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে।

বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস

কালোজিরার বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস নিম্নরূপ—জগৎ: Plantae, বিভাগ: Magnoliophyta, শ্রেণী: Magnoliopsida, বর্গ: Ranunculales, পরিবার: Ranunculaceae, গণ: Nigella, প্রজাতি: Nigella sativa L.

ইউনানি পরিচয় ও ঐতিহাসিক পটভূমি

ইউনানি তিব্বতে কালোজিরাকে হাব্বুল বারকাহ বলা হয়। এর অর্থ বরকতের বীজ। ইউনানি হেকিমরা একে দ্বিতীয় মাত্রার গরম ও শুষ্ক মিজাজের ঔষধি হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করেছেন। এটি দাম, বলঘম, সাফরা ও সওদা আখলাতের ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে। হিপোক্রেটস ও ডায়োসকরিডিসসহ বহু প্রাচীন চিকিৎসক এর ঔষধি গুণ লিপিবদ্ধ করেছেন।

কালোজিরার আখলাত ও মিজাজ

ইউনানি চিকিৎসায় কালোজিরার মিজাজ গরম দ্বিতীয় মাত্রা ও শুষ্ক। এটি চারটি আখলাতের—দাম, বলঘম, সাফরা ও সওদা—ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে। বিশেষ করে বলঘম ও সওদার অতিরিক্ততা দূর করতে এবং হজমশক্তি বৃদ্ধিতে এটি কার্যকর।
মিজাজ হলো ইউনানি চিকিৎসার মৌলিক ধারণা। প্রতিটি মানুষ ও ঔষধির একটি নির্দিষ্ট মিজাজ থাকে। কালোজিরার মিজাজ গরম দ্বিতীয় মাত্রা ও শুষ্ক। এই মিজাজের কারণে এটি শীতপ্রধান রোগ, বলঘমজনিত সমস্যা ও সওদার বৃদ্ধি জনিত অসুস্থতায় উপকারী।

আখলাতের প্রভাব

আখলাত বলতে শরীরের চারটি প্রধান তরল পদার্থকে বোঝায়—দাম (রক্ত), বলঘম (কফ), সাফরা (পিত্ত) ও সওদা (কালা পিত্ত)। কালোজিরা বলঘম ও সওদার পরিশোধন করে। এটি দামের গুণগত মান উন্নত করে। হজমশক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে আখলাতের উৎপাদন ও পরিশোধনে সাহায্য করে।

কালোজিরার প্রধান উপাদান ও রাসায়নিক গঠন

কালোজিরার প্রধান উপাদান থাইমোকুইনোন, যা মিথানলিক বীজ নিষ্কাশনে প্রায় ৫৮% আপেক্ষিক প্রাচুর্যে পাওয়া যায়। এছাড়া পি-সাইমিন, কারভাক্রল, লংগিফোলিন ও নিগেলিডিন উপাদান রয়েছে। এর বীজে ফেনল, ফ্লেভনয়েড, অ্যালকালয়েড ও স্যাপোনিনও আছে।

প্রধান বায়োঅ্যাক্টিভ যৌগ

UHPLC/QTOF-MS বিশ্লেষণে কালোজিরা বীজের মিথানলিক নিষ্কাশনে থাইমোকুইনোন প্রায় ৫৮% আপেক্ষিক প্রাচুর্যে শনাক্ত হয়েছে। এর অন্যান্য প্রধান যৌগের মধ্যে রয়েছে পি-সাইমিন (১৩%), কারভাক্রল (৯%), লংগিফোলিন (১০%) ও নিগেলিডিন (১০%)।

ফাইটোকেমিক্যাল উপাদান

মিথানলিক নিষ্কাশনে কালোজিরা বীজে নিম্নলিখিত ফাইটোকেমিক্যাল পাওয়া যায়—ফেনল: ৬.৩৪ ± ০.৩১ মিগ্রা GAE/মিলি, ফ্লেভনয়েড: ৫.১২ ± ০.২৬ মিগ্রা QE/মিলি, অ্যালকালয়েড: ৪.২১ ± ০.২৪ মিগ্রা/মিলি, স্যাপোনিন: ৩.৯৬ ± ০.২১ মিগ্রা/মিলি, ট্যানিন: ৩.৫৮ ± ০.১৭ মিগ্রা TAE/মিলি।

তৈলাক্ত ও অত্যাবশ্যকীয় তেল

কালোজিরা বীজে তৈলাক্ত তেলের পরিমাণ ৩০-৪০%। এই তেলে লিনোলিক অ্যাসিড ও অলিক অ্যাসিড প্রধান। অত্যাবশ্যকীয় তেলে থাইমোকুইনোন, থাইমোল ও ডাইথাইমোকুইনোন রয়েছে। এই যৌগগুলোর সিনার্জিস্টিক ক্রিয়া কালোজিরার ঔষধি গুণের জন্য দায়ী।

কালোজিরা শরীরে কীভাবে কাজ করে?

কালোজিরার প্রধান সক্রিয় যৌগ থাইমোকুইনোন COX-২ এনজাইম ও NF-κB পথকে নিয়ন্ত্রণ করে প্রদাহ কমায়। এটি Nrf2/HO-১ পথ সক্রিয় করে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস রোধ করে। শুক্রাশয়ে টেস্টোস্টেরন উৎপাদন বাড়াতে এটি হাইপোথ্যালামো-পিটুইটারি-টেস্টিকুলার অক্ষকে উদ্দীপিত করে।

প্রদাহ নিয়ন্ত্রণের পথ

থাইমোকুইনোনের অ্যান্টিইনফ্লেমেটরি কার্যকারিতা বহুবিধ আণবিক পথের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এটি সাইক্লোঅক্সিজেনেজ-২ (COX-২) এনজাইমের ক্রিয়া নিবারণ করে। পাশাপাশি নিউক্লিয়ার ফ্যাক্টর কাপ্পা বি (NF-κB) এর অভিব্যক্তি দমন করে। এটি IL-1β, IL-6, TNF-α এর মতো প্রো-ইনফ্লেমেটরি সাইটোকাইনের মাত্রা হ্রাস করে।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকারিতা

থাইমোকুইনোন Nrf2/HO-১ পথ সক্রিয় করে এন্ডোজেনাস অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এনজাইমের মাত্রা বাড়ায়। এটি ক্যাটালেজ, গ্লুটাথিয়ন পেরক্সিডেজ ও সুপারঅক্সাইড ডিসমিউটেজের ক্রিয়া বৃদ্ধি করে। ম্যালোনডায়াল্ডিহাইডের মতো লিপিড পেরক্সিডেশন মার্কার হ্রাস পায়।

যৌন স্বাস্থ্যে কার্যপদ্ধতি

পুরুষের যৌন স্বাস্থ্যে কালোজিরা হাইপোথ্যালামো-পিটুইটারি-টেস্টিকুলার অক্ষকে উদ্দীপিত করে। এটি FSH ও LH নিঃসরণ বাড়ায়। এই হরমোনগুলো লেইডিগ কোষকে টেস্টোস্টেরন উৎপাদনে উৎসাহিত করে। অক্সিডেটিভ স্ট্রেস হ্রাস করে শুক্রাশয়ের কোষকে সুরক্ষা দেয়। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই ডোজ গ্রহণ করবেন না।

কালোজিরার স্বাস্থ্যগত উপকারিতা

কালোজিরা হজম, শ্বাসযন্ত্র, প্রদাহজনিত রোগ, ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে উপকারী। এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল গুণ রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। ত্বক ও চুলের স্বাস্থ্যেও এর তেল ব্যবহৃত হয়।

হজম ও শ্বাসযন্ত্রের উপকারিতা

কালোজিরা গ্যাস্ট্রিক আলসার প্রতিরোধে সাহায্য করে। থাইমোকুইনোন ইথানল দ্বারা সৃষ্ট মিউকোসাল আলসারেশন নিবারণ করে। এটি হিস্টামিন নিঃসরণ দমন করে অ্যাজমার লক্ষণ উপশমে সাহায্য করে। বুক কাশি ও শ্বাসকষ্টে এর বীজ ও তেল ব্যবহার করা হয়।

ডায়াবেটিস ও হৃদস্বাস্থ্য

কালোজিরা α-গ্লুকোসিডেজ ও α-অ্যামাইলেজ এনজাইমের ক্রিয়া নিবারণ করে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

এটি রক্তচাপ ও লিপিড প্রোফাইল উন্নত করতে পারে। হৃদপিণ্ডের স্বাস্থ্য রক্ষায় এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুণ কার্যকর।

রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা

কালোজিরার তেল বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল কার্যকারিতা প্রদর্শন করে। স্ট্যাফাইলোককাস অরিয়াস, ব্যাসিলাস সাবটিলিস ও লিস্টেরিয়া মনোসাইটোজেনেসের বিরুদ্ধে MIC ছিল ৬২.৫ মাইক্রোগ্রাম/মিলি। ত্বকের একজিমা ও ফুসকুড়িতে তেলের প্রলেপ উপকারী।

কালোজিরা পুরুষের যৌন স্বাস্থ্যে কীভাবে সাহায্য করে?

কালোজিরা পুরুষের শুক্রাণুর গুণগত মান, সংখ্যা ও টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ২ গ্রাম কালোজিরা গুঁড়ো ৩ মাস সেবনে শুক্রাণুর সংখ্যা ৩৯.২৭% বৃদ্ধি পেয়েছে। টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ২৯.৩৫% বেড়েছে।

শুক্রাণুর গুণগত মান উন্নয়ন

একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ৪০ জন বন্ধ্যা পুরুষকে প্রতিদিন ২ গ্রাম কালোজিরা গুঁড়ো ৩ মাস দেওয়া হয়। ফলাফলে শুক্রাণুর সংখ্যায় ৩৯.২৭%, সক্রিয় গতিশীলতায় ৫৯.৭১%, জীবন্ত শুক্রাণুর হারে ৪৬.৮৩% ও স্বাভাবিক আকৃতিতে ২২.৬৫% বৃদ্ধি পাওয়া যায়।

টেস্টোস্টেরন ও যৌন হরমোন

ওই একই গবেষণায় সিরাম টেস্টোস্টেরন ২৯.৩৫%, FSH ৪৭.৪৬% ও LH ৩২.৭৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। আরেকটি ডবল-ব্লাইন্ড প্লেসিবো-নিয়ন্ত্রিত ট্রায়ালে ৫ মিলি কালোজিরা তেল প্রতিদিন ২ মাস সেবনে শুক্রাণুর সংখ্যা, গতিশীলতা ও আকৃতি উন্নত হয়। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই ডোজ গ্রহণ করবেন না।

কালোজিরা খাওয়ার নিয়ম ও ব্যবহারবিধি

কালোজিরা বীজ, গুঁড়ো ও তেল—তিন রূপেই সেবন করা যায়। ঐতিহ্যগতভাবে বীজ ভেজে গুঁড়ো করে মধু বা পানিতে মিশিয়ে খাওয়া হয়। তেল সরাসরি খাওয়া যায় বা ত্বকে প্রয়োগ করা যায়। চিকিৎসকের নির্দেশিত মাত্রায় সেবন করুন।

সেবনের পদ্ধতি

১. সম্পূর্ণ বীজ: নান রুটির ওপর ছড়িয়ে বা তরকারিতে ব্যবহার করা যায়।
২. গুঁড়ো: এক থেকে দুই গ্রাম গুঁড়ো মধু বা পানিতে মিশিয়ে খাওয়া যায়।
৩. তেল: দুই দশমিক পাঁচ থেকে পাঁচ মিলি তেল দৈনিক সেবন করা যায়।
৪. প্রলেপ: ত্বকের সমস্যায় তেল সরাসরি লাগানো যায়।

ঐতিহ্যগত ব্যবহার

ইউনানি চিকিৎসায় কালোজিরা হজমশক্তি বৃদ্ধি, কফ নিরাময়, বুক কাশি, মাথাব্যথা, চর্মরোগ ও জ্বরে ব্যবহৃত হয়। এটি শরীরের অপ্রয়োজনীয় তরল পদার্থ দূর করে শক্তি ও স্ফূর্তি জোগায়।

কালোজিরার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও অপকারিতা

অতিরিক্ত পরিমাণে কালোজিরা ত্বকের র্যাশ, বমিভাব ও পেটের অস্বস্তি সৃষ্টি করতে পারে। এটি রক্ত জমাট বাঁধা ধীর করে। তেল দীর্ঘমেয়াদি ত্বকে প্রয়োগে এলার্জি হতে পারে। রক্তচাপ কমানো ও ঘুম পাড়ানো প্রভাবও রয়েছে।
কালোজিরার সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে ত্বকের র্যাশ ও এলার্জি, বমিভাব ও পেটের অস্বস্তি, রক্ত জমাট বাঁধা ধীর করার প্রবণতা, অতিরিক্ত ঘুম বা নিদ্রাযুক্ত অবস্থা, রক্তচাপ হ্রাস। অতিরিক্ত মাত্রায় সেবন এসব সমস্যার কারণ হয়।

বিশেষ সতর্কতা ও নিষেধাজ্ঞা

গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মহিলাদের কালোজিরা তেল সেবন নিষেধ। থাইমোকুইনোনের গর্ভপাত ঘটানোর ঝুঁকি রয়েছে। রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা, রক্তচাপের ওষুধ ও ইমিউন ডিসঅর্ডারে আক্রান্তরা সাবধানে ব্যবহার করবেন।

গর্ভাবস্থা ও স্তন্যপান

গর্ভাবস্থায় কালোজিরা তেলের মুখে সেবন নিষেধ। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে উচ্চ ডোজের থাইমোকুইনোন গর্ভপাত ঘটাতে পারে।স্তন্যদানকারী মহিলাদেরও এটি এড়িয়ে চলা উচিত।

দীর্ঘস্থায়ী রোগ ও ওষুধের বিক্রিয়া

রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যায় আক্রান্তরা কালোজিরা সেবন করবেন না। রক্তচাপের ওষুধ গ্রহণকারীরা সতর্ক থাকুন। ইমিউন সিস্টেমের ব্যাধিতে আক্রান্তরা বড় পরিমাণে সেবন এড়িয়ে চলুন।

উপসংহার

কালোজিরা হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী একটি ঔষধি বীজ। ইউনানি ও আধুনিক চিকিৎসা উভয় ক্ষেত্রেই এর গুরুত্ব অপরিসীম। আধুনিক গবেষণা এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্টিইনফ্লেমেটরি ও পুরুষের যৌন স্বাস্থ্য উন্নয়নের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। তবে সঠিক মাত্রায় ও চিকিৎসকের পরামর্শে সেবন করলেই এর পূর্ণ উপকার পাওয়া যায়। অতিরিক্ত সেবন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে। নিয়মিত সেবন, সুষম খাদ্যাভ্যাস ও সুস্থ জীবনযাপনের মাধ্যমে সর্বোত্তম ফলাফল অর্জন করা যায়। hakimsultan.com-এ আরও ইউনানি ও প্রাকৃতিক চিকিৎসা সম্পর্কিত তথ্য পেতে আমাদের ব্লগ নিয়মিত পড়ুন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

প্রশ্ন ১: কালোজিরা প্রতিদিন কতটুকু খাওয়া উচিত?
উত্তর: ঐতিহ্যগতভাবে এক থেকে দুই গ্রাম গুঁড়ো বা দুই দশমিক পাঁচ থেকে পাঁচ মিলি তেল দৈনিক সেবন করা যায়। তবে ব্যক্তিভেদে মাত্রা ভিন্ন হতে পারে। চিকিৎসকের নির্দেশিত মাত্রায় সেবন করুন।
প্রশ্ন ২: কালোজিরা তেল ও গুঁড়োর মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: গুঁড়োতে সম্পূর্ণ বীজের আঁশ ও খনিজ পদার্থ থাকে। তেলে তৈলাক্ত যৌগ ও থাইমোকুইনোন বেশি ঘনীভূত থাকে। ত্বকের সমস্যায় তেল বেশি উপযোগী। হজমের জন্য গুঁড়ো বেশি কার্যকর।
প্রশ্ন ৩: কালোজিরা ডায়াবেটিসে উপকারী কিনা?
উত্তর: হ্যাঁ, কালোজিরা α-গ্লুকোসিডেজ ও α-অ্যামাইলেজ এনজাইমের ক্রিয়া নিবারণ করে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। গবেষণায় এর অ্যান্টিডায়াবেটিক কার্যকারিতা প্রমাণিত।
প্রশ্ন ৪: কালোজিরা ওজন কমাতে সাহায্য করে কিনা?
উত্তর: কালোজিরা মেটাবলিজম বৃদ্ধি ও লিপিড প্রোফাইল উন্নত করতে পারে। তবে ওজন কমানোর জন্য একে একক ঔষধি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামের সাথে এর সেবন ফলপ্রসূ।
প্রশ্ন ৫: কালোজিরা কি গর্ভাবস্থায় নিরাপদ?
উত্তর: না, গর্ভাবস্থায় কালোজিরা তেলের মুখে সেবন নিষেধ। থাইমোকুইনোন গর্ভপাত ঘটাতে পারে। স্তন্যদানকারী মহিলাদেরও এটি এড়িয়ে চলা উচিত।
প্রশ্ন ৬: কালোজিরা পুরুষের বন্ধ্যত্বে কতদিন খেতে হয়?
উত্তর: ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দুই গ্রাম গুঁড়ো তিন মাস ও পাঁচ মিলি তেল দুই মাস সেবনে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই ডোজ গ্রহণ করবেন না।
প্রশ্ন ৭: কালোজিরা তেল ত্বকে কীভাবে ব্যবহার করব?
উত্তর: তেল সরাসরি বা ক্যারিয়ার তেলে মিশিয়ে ত্বকে লাগানো যায়। একজিমা, ফুসকুড়ি ও শুষ্ক ত্বকে উপকারী। দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে এলার্জি হতে পারে। পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করুন।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স

১. Amin B, Hosseinzadeh H. Black Cumin (Nigella sativa) and Its Active Constituent, Thymoquinone: An Overview on the Analgesic and Anti-inflammatory Effects. Planta Med. ২০১৬;৮২:৮-১৬. DOI: 10.1055/s-0035-1557838
২. Marbat MM, Ali MA, Hadi AM. The use of Nigella sativa as a single agent in treatment of male infertility. Tikrit Medical Journal. ২০১৩;১৯(১).
৩. Kolahdooz M et al. Effects of Nigella sativa L. seed oil on abnormal semen quality in infertile men: a randomized, double-blind, placebo-controlled clinical trial. Phytomedicine. ২০১৪;২১(৬):৯০১-৯০৫. DOI: 10.1016/j.phymed.2014.02.006
৪. Exploring the Multifaceted Phytochemical Profile of Nigella sativa and the Therapeutic Potential of Thymoquinone. Pharmaceuticals. ২০২৬;১৯(৩):৫০৩. DOI: 10.3390/ph19030503
৫. Hannan MA et al. Black Cumin (Nigella sativa L.): A Comprehensive Review on Phytochemistry, Health Benefits, Molecular Pharmacology, and Safety. Nutrients. ২০২১;১৩(৬):১৭৮৪. DOI: 10.3390/nu13061784
৬. Leisegang K et al. The effect of Nigella sativa oil and metformin on male seminal parameters and testosterone in Wistar rats exposed to an obesogenic diet. Biomedicine & Pharmacotherapy. ২০২১;১৩৩:১১১০৮৫.
৭. Anti-inflammatory effects of thymoquinone and its protective effects against several diseases. Biomedicine & Pharmacotherapy. ২০২১;১৪০:১১১৭৬২.
৮. Antioxidant and Anti-Inflammatory Properties of Nigella sativa Oil in Human Pre-Adipocytes. Antioxidants. ২০১৯;৮(২):৫১. DOI: 10.3390/antiox8020051
৯. Kalonji (Nigella sativa Linn) a comprehensive review on Unani aspect. Unani Journal.
হেকিম সুলতান
লেখক সম্পর্কে

হেকিম সুলতান

BUMS, খুলনা ইউনানি মেডিকেল কলেজ