বিদারীকন্দ (Pueraria tuberosa): বৈজ্ঞানিক ও ইউনানি পরিচয়, উপাদান, উপকারিতা ও খাওয়ার নিয়ম

বিদারীকন্দ (Pueraria tuberosa)
বিদারীকন্দ একটি শক্তিবর্ধক, শুক্রজনক ও বৃংহণীয় ঔষধি। এর বৈজ্ঞানিক নাম Pueraria tuberosa (Roxb. ex Willd.) DC.। এটি Fabaceae পরিবারের বহুবর্ষজীবী লতা। ভারতীয় উপমহাদেশে ইউনানি ও আয়ুর্বেদ উভয় চিকিৎসায় এটি শুক্রাণু বৃদ্ধি, শারীরিক দুর্বলতা দূরীকরণ ও স্তন্যদায়ক হিসেবে প্রাচীনকাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আধুনিক গবেষণায় এর অ্যান্ড্রোজেনিক, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও হেপাটোপ্রোটেকটিভ কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে।

বিদারীকন্দ কী?

বিদারীকন্দ Fabaceae পরিবারের একটি কন্দজাতীয় ঔষধি যার বৈজ্ঞানিক নাম Pueraria tuberosa এটি ভারতীয় কুডজু নামেও পরিচিত। এর কন্দ মিষ্টি, শীতল ও পুষ্টিগুণে পরিপূর্ণ। আয়ুর্বেদ ও ইউনানি চিকিৎসায় একে মূলত শুক্রবর্ধক, বলবর্ধক ও স্তন্যদায়ক ঔষধি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এটি শরীরের ত্রিদোষের মধ্যে বাত ও পিত্ত নাশক।

বিদারীকন্দের বৈজ্ঞানিক পরিচয় কেমন?

বিদারীকন্দের বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস নিম্নরূপ: রাজ্য Plantae, বিভাগ Magnoliophyta, শ্রেণি Rosidae, বর্গ Fabales, পরিবার Fabaceae, গণ Pueraria DC., প্রজাতি Pueraria tuberosa
এটি এক বড় আকারের লতা যার কন্দ গোলাকার বা পাত্রাকৃতির, ভেতর সাদা ও স্টার্চযুক্ত। কন্দের ব্যাস প্রায় ২৫ সেমি পর্যন্ত হতে পারে।

ইউনানি মিজাজ ও আখলাত

বিদারীকন্দের মিজাজ প্রধানত বারিদ (শীতল) ও রাত্ব (আর্দ্র)। ইউনানি তত্ত্ব অনুযায়ী এর গুণাবলী বলঘামি আখলাতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে ক্লাসিক্যাল ইউনানি গ্রন্থে এই নির্দিষ্ট ঔষধির মিজাজ সংক্রান্ত সরাসরি তথ্য সীমিত। এর শীতল ও স্নিগ্ধ প্রকৃতি আখলাতে বালঘামের প্রাধান্য বৃদ্ধি করতে পারে। ফলে কফজনিত রোগে এটি অনুচিত।

আয়ুর্বেদীয় ভাষায় এর রস মধুর, গুণ গুরু ও স্নিগ্ধ, বীর্য শীতল এবং বিপাক মধুর।

ইউনানি দৃষ্টিকোণ থেকে এটি দম্বী মিজাজের রোগীদের জন্য উপকারী। এর বৃংহণীয় ও মুকাওয়্বি-ই-বাহ গুণ শুক্রাণুর সংখ্যা ও গুণগত মান উন্নয়নে সহায়ক।

বিদারীকন্দের রাসায়নিক উপাদান

বিদারীকন্দের কন্দে আইসোফ্লেভোন, প্টেরোকার্পানোয়েড, স্টেরয়েড ও কার্বোহাইড্রেট প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। মূল উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে পুয়েরারিন (৮.৩১%), ডেইডজিন (১.৭০%), জেনিস্টেইন (১.৩৭%), টিউবেরোসিন, হাইড্রক্সিটিউবেরোসোন, বায়োচ্যানিন এ, বায়োচ্যানিন বি, কোয়ারসেটিন ও আইরিসোলিডোন। এছাড়া β-সিটোস্টেরল, স্টিগমাস্টেরল, টিউবেরোস্টান ও পুয়েরারোস্টানের মতো যৌগও বিদ্যমান।

শুক্রাণু বৃদ্ধি ও শারীরিক শক্তি বাড়ায় কীভাবে?

বিদারীকন্দ পিটুইটারি-গোনাডাল অক্ষের মাধ্যমে টেস্টোস্টেরন, এলএইচ ও এফএসএইচ বৃদ্ধি করে শুক্রাণুর সংখ্যা ও গতিশীলতা উন্নত করে। প্রাণীগবেষণায় দেখা গেছে, ১৫০ মিগ্রা/কেজি ডোজে শুক্রাণুর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ দলের ১২০.২ মিলিয়ন/মিলি থেকে বেড়ে ১৩২.১ মিলিয়ন/মিলি হয়েছে।
সেমিনাল ভেসিকেলের ফ্রুক্টোজ ঘনত্বও ২৪.১৭% বৃদ্ধি পেয়েছে।
এর পুয়েরারিন ও ডেইডজিন শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমিয়ে লিভার, কিডনি ও হৃৎপিণ্ডের কোষকে রক্ষা করে।
ফলে দেহের সার্বিক সহনশীলতা ও শক্তি বৃদ্ধি পায়।

বিদারীকন্দের প্রধান উপকারিতা

বিদারীকন্দ শুক্রবর্ধক, বলবর্ধক, স্তন্যদায়ক, হৃৎপিণ্ড রক্ষাকারী ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কার্যকর। এর প্রধান উপকারিতাগুলো:

১. শুক্রাণু বৃদ্ধি: পুরুষে শুক্রাণুর সংখ্যা ও গুণমান উন্নয়নে সহায়ক।

২. যৌনশক্তি বর্ধন: মৈথুনশক্তি ও কামোত্তেজনা বৃদ্ধি করে।

৩. স্তন্যদায়ক: স্তন্যপায়ী মায়ের দুধের পরিমাণ বাড়ায়।

৪. বলবর্ধক: দুর্বল শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কের শারীরিক শক্তি ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

৫. হৃৎপিণ্ডের সুরক্ষা: করোনারি ধমনীর রোগে ফাইব্রিনোলাইটিক কার্যকারিতা প্রদর্শন করেছে।

৬. অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট: ফ্রি র‍্যাডিকেল দমন করে ত্বক ও কোষের বার্ধক্য প্রতিরোধে সাহায্য করে।

৭. হেপাটোপ্রোটেকটিভ: লিভার ও প্লীহার কোষ পুনর্গঠনে সহায়ক।

৮. ব্রংহণীয়: শরীরের ওজন ও মাংসপেশি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

খাওয়ার নিয়ম ও মাত্রা

বিদারীকন্দ সাধারণত চূর্ণ, ক্বাথ বা ফ্রেশ জুস আকারে সেবন করা হয়। চূর্ণের মাত্রা ৩ থেকে ৬ গ্রাম।
শুক্রাণু বৃদ্ধির জন্য ৩-৫ গ্রাম চূর্ণ গরুর দুধ বা ঘীর সাথে খেতে হয়।
ক্বাথ হিসেবে ঠাণ্ডা সেদন ৪০-৫০ মিলি পরিমাণে লিভার ও প্লীহা বলবর্ধনে দেওয়া হয়।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই ডোজ গ্রহণ করবেন না।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও সতর্কতা

সাধারণ মাত্রায় বিদারীকন্দ নিরাপদ, তবে অতিরিক্ত সেবনে বমি বমি ভাব, মাথাব্যথা ও জ্বর হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে রক্ত জমাট বাঁধা ধীর করে এবং কার্ডিওভাসকুলার ওষুধের সাথে বিক্রিয়া করতে পারে। অত্যধিক পরিমাণে কিডনির ক্ষতির প্রতিবেদন রয়েছে। কফপ্রধান ব্যক্তি, স্থূলতা, হাঁপানি ও সর্দি-কাশিতে এটি এড়িয়ে চলা উচিত।

শুক্রাণু ও শারীরিক শক্তি বৃদ্ধির ফর্মুলা

বিদারীকন্দ দুধ, ঘী ও অন্যান্য ঔষধির সাথে মিশিয়ে শুক্রবর্ধক টনিক তৈরি করা যায়। কার্যকর ফর্মুলাগুলো:
১. মৌলিক শুক্রবর্ধক চূর্ণ: বিদারীকন্দ চূর্ণ ৩-৫ গ্রাম গরুর দুধ বা ঘীর সাথে প্রাতঃকালে সেবন করুন।
২. বলবর্ধক মিশ্রণ: বিদারীকন্দ চূর্ণের সাথে গম বা যবের সাতু ঘীতে ভেজে দুধের সাথে খেতে হয় যৌন দুর্বলতা ও শারীরিক শক্তির জন্য।
৩. স্পার্মাটোরিয়ার জন্য: তাজা কন্দের রসের সাথি জিরা ও চিনি মিশিয়ে খাওয়া হয়।
৪. দুধের সাথে বলবর্ধক টনিক: বিদারীকন্দ চূর্ণ দুধে মিশিয়ে নিয়মিত সেবনে দেহের ভর বৃদ্ধি পায়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই ডোজ গ্রহণ করবেন না।

কাদের জন্য সতর্কতা প্রয়োজন?

গর্ভবতী মহিলা, শিশু, দীর্ঘস্থায়ী রোগী ও কফপ্রবণ ব্যক্তিদের বিদারীকন্দ সেবনে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এদের ক্ষেত্রে অবশ্যই যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। যাঁরা অ্যান্টিকোয়াগুলেন্ট ওষুধ সেবন করছেন তাঁদের জন্য এটি বিপজ্জনক হতে পারে। রক্তপাতজনিত সমস্যা, হৃদরোগ ও কিডনি রোগে আক্রান্ত রোগীদের এটি পরিহার করা উচিত।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

বিদারীকন্দ কতদিন খেলে ফল পাওয়া যায়?

ফলাফল ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়। সাধারণত নিয়মিত সেবনে ৪-৮ সপ্তাহের মধ্যে শারীরিক শক্তি ও যৌনশক্তির উন্নতি অনুভূত হয়। তবে শুক্রাণুর সংখ্যা বৃদ্ধি পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ণয় করতে হবে।

বিদারীকন্দ সরাসরি খাওয়া যায় কি?

না, কাঁচা কন্দ সরাসরি খাওয়া উচিত নয়। এটি শুকিয়ে চূর্ণ বা ক্বাথ আকারে সেবন করতে হয়। তাজা কন্দের রস নির্দিষ্ট ফর্মুলায় ব্যবহার করা যায়।

বিদারীকন্দ ও অশ্বগন্ধা একসাথে খাওয়া যায় কি?

হ্যাঁ, উভয়ই বলবর্ধক ও শুক্রবর্ধক ঔষধি। তবে মিশ্রিত সেবনের আগে অবশ্যই যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

বিদারীকন্দ কি কিডনির জন্য ক্ষতিকর?

সাধারণ মাত্রায় নিরাপদ, কিন্তু অতিরিক্ত সেবন কিডনির ক্ষতি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করুন।

বিদারীকন্দ কি ওজন বাড়ায়?

হ্যাঁ, এর বৃংহণীয় গুণ শরীরের ওজন ও মাংসপেশির পরিমাণ বৃদ্ধিতে সহায়ক। দুধের সাথে নিয়মিত সেবনে ক্ষীণদেহী ব্যক্তির ওজন বাড়তে পারে।

বিদারীকন্দ কি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে?

এর কার্ডিওপ্রোটেকটিভ ও ফাইব্রিনোলাইটিক কার্যকারিতা হৃৎসংবহন তন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে। তবে রক্তচাপের রোগীদের চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে সেবন করতে হবে।

বিদারীকন্দ কোথায় পাওয়া যায়?

যেকোনো আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি ঔষধালয়ে বিদারীকন্দ চূর্ণ বা কাঁচা কন্দ পাওয়া যায়। অনলাইনেও সার্টিফাইড হারবাল স্টোর থেকে ক্রয় করা যায়।

উপসংহার

বিদারীকন্দ একটি বহুমুখী ঔষধি যা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় শুক্রবর্ধক, বলবর্ধক ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে প্রমাণিত। সঠিক মাত্রায় ও চিকিৎসকের পরামর্শে এটি পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্যই উপকারী। তবে অতিরিক্ত সেবন ও স্বয়ংচালিত ডোজ নির্ণয় থেকে বিরত থাকুন। আপনার শারীরিক অবস্থা যাচাই করে যোগ্য হাকিম বা চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে বিদারীকন্দ সেবন শুরু করুন।
হেকিম সুলতান
লেখক সম্পর্কে

হেকিম সুলতান

BUMS, খুলনা ইউনানি মেডিকেল কলেজ

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স

১. PMC NIH Review (২০২০): Pueraria tuberosa: A Review on Traditional Uses, Pharmacological Potential, and Phytochemistryhttps://pmc.ncbi.nlm.nih.gov/articles/PMC7941752/
২. WJPR (২০২৪): Chemical composition and pharmacological activities of vidarikandhttps://wjpr.s3.ap-south-1.amazonaws.com/article_issue/5ee120534ebaaf7edff3ff12c8baff3f.pdf
৩. IJSDR: Pueraria tuberosa (Vidarikanda) Phytochemistry and Therapeutic Potentialhttps://www.ijsdr.org/papers/IJSDR1907023.pdf
৪. JAIMS: Critical Review on Vidarikanda (Pueraria tuberosa Dc.)https://jaims.in/jaims/article/view/4833/7540
৫. EasyAyurveda (২০২৩): Vidarikand Pueraria tuberosa Uses, Research, Side Effectshttps://www.easyayurveda.com/vidarikand-pueraria-tuberosa-indian-kudzu/
৬. PMC NIH (২০১৪): Pueraria tuberosa DC Extract Improves Androgenesis and Sexual Behavior via FSH LH Cascadehttps://pmc.ncbi.nlm.nih.gov/articles/PMC3893017/
৭. IJAPR (২০১৬): Review Article on Vidarikandhttps://ijapr.in/index.php/ijapr/article/download/294/309/
৮. PMC (২০১৭): A scientific correlation between dystemprament in Unani medicine and diseaseshttps://pmc.ncbi.nlm.nih.gov/articles/PMC5217817/